পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের "সেটেলার" আখ্যা—একটি ভ্রান্ত ধারণা

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি সংবেদনশীল অঞ্চল, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং স্থানান্তরিত বাঙালিদের মধ্যে বহু বছর ধরে নানা মতবিরোধ চলে আসছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয় হলো বাঙালিদের "সেটেলার" বা "উপনিবেশ স্থাপনকারী" হিসেবে আখ্যা দেওয়া। এই শব্দটি কেবলমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, যা ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সেটেলমেন্ট শব্দটি ইংরেজি ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো পুনর্বাসন। সাধারণত সেটেলমেন্ট এমন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যেখানে কোনো জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভিটেমাটি হারিয়ে রাষ্ট্রের অধীনে নির্দিষ্ট জায়গায় পুনর্বাসিত হয়। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এই শব্দের ব্যবহার সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।


১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সরকার সমতল অঞ্চল থেকে বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তর শুরু করে। এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য অঞ্চলে জনবসতি বাড়ানো এবং ওই এলাকার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। তাহের আহমদ এবং অরুণ ভট্টাচার্যের মতো বিশিষ্ট ইতিহাসবিদদের রচনায় দেখা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, যা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন প্রক্রিয়া থেকে ভিন্ন ছিল না। এ ক্ষেত্রে বাঙালিদেরকে কোনো শরণার্থী হিসেবে না এনে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে পার্বত্য অঞ্চলে আনা হয়।


পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের আগমন নিয়ে ঐতিহাসিক দলিল এবং পণ্ডিতদের গবেষণা থেকে জানা যায়, বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন ছিল ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে শুরু হওয়া একটি সরকারি পরিকল্পনার অংশ। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে মূলত সমতল অঞ্চলের জমি-জমার সংকটে থাকা মানুষদেরকে পার্বত্য এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজের জন্য স্থানান্তরিত করা হয়। ড. সলিমুল্লাহ খান এর "বাংলাদেশের পুনর্বাসন নীতিমালা" বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ স্থানান্তরের ঘটনা নতুন কিছু নয় এবং এটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে ঘটেছে।


এক্ষেত্রে "সেটেলার" শব্দটি একদমই প্রযোজ্য নয়, কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত বাঙালিরা কোনো শরণার্থী ছিল না। তাদের নিজেদের জমিজমা এবং বসবাসের স্থান ছিল, এবং তারা পার্বত্য অঞ্চলে পুনর্বাসিত হয়নি, বরং রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছিল। অ্যান্টনি রেজ এর "Colonial Settler Myth in South Asia" বইটি এই প্রসঙ্গটি আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে, যেখানে বাঙালিদেরকে "সেটেলার" বলা শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের আগমন এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, পার্বত্য অঞ্চলের তথাকথিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীও এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা নয়। ড. মো. মুজিবুর রহমান এর গবেষণা থেকে জানা যায়, ১৭০০ সালের দিকে মঙ্গোলিয়া এবং তিব্বত থেকে উপজাতিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে। ব্রিটিশ শাসনামলে তাদের বসতি স্থাপন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয়। তবে তার আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছু বাঙালিরও বসবাস ছিল।


তাহলে, বাঙালিদেরকে "সেটেলার" বলে চিহ্নিত করা যে একটি গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, তা একাধিক ঐতিহাসিক সূত্র থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি অভ্যন্তরীণ অঞ্চল এবং সেখানে বাঙালিদের বসতি স্থাপনকে সেটেলমেন্ট হিসেবে অভিহিত করা একটি ষড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা, যা এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে করা হয়।

সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের "সেটেলার" হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা একটি ভ্রান্ত ধারণার ফল। ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, বাঙালিরা কোনো শরণার্থী ছিল না, বরং রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত হয়েছিল। বাঙালিদের সেটেলার হিসেবে আখ্যা দেওয়া প্রকৃতপক্ষে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা, যা এই অঞ্চলের জাতিগত সম্প্রীতিকে ব্যাহত করতে ব্যবহার করা হয়েছে। রাষ্ট্র এবং সমাজের দায়িত্ব হলো এই ধরনের ভ্রান্ত ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে সত্যিকারের ইতিহাস তুলে ধরা এবং সবার মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখা।

-রবিউল জিহাদ 


Post a Comment

1 Comments